মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ০১:৩৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম
আজকের পত্রিকা -০৪-০৬-২০২২ সৈয়দপুরে মাদক ব্যবসায়ীদের টার্গেট এখন ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ কমিটি, উদ্দেশ্য পদ পদবী বাগিয়ে নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসা  সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জে নিরাপত্তা কর্মীর উপর যুবলীগ নেতার ক্ষমতার অপব্যবহার সৈয়দপুরের কল্যান ট্রাষ্টের নামে লন্ডাবাজার অবৈধ রেল মার্কেটের কোটি কোটি টাকা লুটপাঠ সৈয়দপুর রেল কারখানার জায়গায় অবৈধভাবে স্থাপিত সরকারী শিশু কল্যাণ ট্রাষ্ট স্কুল দুর্নীতিবাজ রেল কর্মকর্তার যোগসাজসে ভূমিদস্যুরা হাতিয়ে নিয়েছে রেলের কোটি টাকার সম্পদ সৈয়দপুর পৌর আ’লীগের ইফতার মাহফিলে দাওয়াত পাননি ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোকছেদুল মোমিন সৈয়দপুরে আসামীদের সাথে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করলেন মোকছেদুল মোমিন সৈয়দপুর পৌরসভা কর্তৃক সরকারী সম্পত্তি আত্মসাতের অপরাধে রেল কর্তৃপক্ষের মামলা সৈয়দপুর বিমানবন্দর রোডে ৫৪৪নং রেল কোয়ার্টার ভেঙ্গে কোটি টাকার মার্কেট নির্মাণ, নির্বিকার রেল প্রশাসন

আজ বিশ্ব মা দিবস-সন্তান থেকেও মা বৃদ্ধাশ্রমে

জি.এম জয়
  • সময় রবিবার, ৯ মে, ২০২১
  • ৩৫৬ বার পঠিত

‘চল্লিশ বছর আগোত স্বামী মারা গেইছে। কত কষ্ট করি ছাওয়াপোয়াক (ছেলে-মেয়ে) মানুষ করচু। নিজে না খ্যায়া ছাওয়াক খোয়াচু (খাওয়ানো)। আজই সেই ছাওয়ার ঘরোত মোর থাকার জাগা নাই। বেটি তিনটার বিয়াও হইছে। ব্যাটা দুইটাও বিয়া করি বউ-ছাওয়া নিয়্যা ঢাকাত থাকে। ব্যাটার বউ দেখাশুনা করে না। আইজ কাইলক্যার (এখনকার) বউরা তো শ্বশুড়-শাশুড়ির দেইখপার পারে না। বেটিরা তো পরের বাড়িত থাকে। কেউ আমার দেখাশুনা করে না, এজন্য আশ্রমে এসে আছি। যতদিন বাঁচি আছি, এ্যটে থাকমো।’ – কাঁদতে কাঁদতে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন বৃদ্ধা নুরজাহান বেগম।

সত্তরোর্ধ্ব বয়সী এই বৃদ্ধা থাকেন দেবী চৌধুরানী বয়স্ক পুণর্বাসন কেন্দ্রে। রংপুরের পীরগাছা উপজেলা সদর থেকে ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে রংপুর-সুন্দরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের কৈকুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের পাশে এই বৃদ্ধাশ্রমের অবস্থান। বিশ্ব মা দিবস আজ। দিনটি উপলক্ষে গতকাল শনিবার দুপুরে ওই পুণর্বাসন কেন্দ্রে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায় একেকজন মায়ের একেক রকমের দুঃখকথন। প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্ব মা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। যদিও মাকে ভালোবাসা-শ্রদ্ধা জানানোর কোন দিনক্ষণ ঠিক করে হয় না- তবুও মাকে গভীর মমতায় স্মরণ করার দিন আজ।

ইতিহাসখ্যাত দেবী চৌধুরানীর নামে পরিচিত প্রতিষ্ঠিত এই বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রটিতে বিধবা নুরজাহান বেগমের মতো ভাগ্যতাড়িত ২২ জন (বর্তমান সংখ্যা) বৃদ্ধ-বৃদ্ধা জীবনের পড়ন্ত বেলায় পেয়েছে নিরাপদ আশ্রয়। পুনর্বাসন কেন্দ্রটিতে তিন বেলা উন্নতমানের খাবার, চিকিৎসাসেবা, ওষুধ, পোশাক-পরিচ্ছদসহ নানা সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন এসব অসহায় বাবা-মা।

সরেজমিনে দেখা যায়, বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রটিতে আশ্রিতরা কেউ ঘুমাচ্ছেন, কেউবা নামাজ পড়ছেন। কেউ ঘরে বসে পত্রিকার পাতায় নজর দিচ্ছেন। আর কেউবা ব্যস্ত জীবনের ফেলে আসা স্মৃতিগুলো গল্পে গল্পে একে অপরকে শোনাচ্ছেন। যেন সবার চোখে মুখে না পাওয়ার ছাপ। এসব মানুষ পুণর্বাসন কেন্দ্রে নতুন কাউকে আসতে দেখলেই আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠে। ভাবেন হয়তো কেউ তাদের খোঁজ নিতে এসেছেন। নয় তো নিজের পরিবারের ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি বা আত্মীয়স্বজন মনে করে ছুটে যান তারা।

বৃদ্ধাশ্রমের পশ্চিম দুয়ারীতে বসে কথা হয় পঁচাত্তর বয়সী বৃদ্ধা আমেনা বেগমের সাথে। তার স্বামী হবিবর রহমান পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন। পরিবারে একমাত্র ছেলে রয়েছে। কিন্তু সে মায়ের দেখাশুনা করায় আমেনা ভিটেমাটি ছেড়ে বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রটিতে এসে মাথা গোঁজার আশ্রয় পেয়েছেন। সেখানে ঢাকা পোস্টকে শোনালেন জীবনের শেষ বেলায় এসে তাঁর করুণ বাস্তবতার গল্প।

আমেনা বলেন, ‘স্বামী মরছে অনেক আগোত। ব্যাটা একটা তায় (সে) থাকিয়্যাও (থেকেও) নাই। বড় ছাওয়াক নিয়া ব্যাটার সংসার। মুই মাও হন, মোর জাগা নাই। ব্যাটা-বউ কায়ো মোর দেখাশুনা করে না। সবার খালি অভাব আর অভাব। কায়ো খোঁজও নেয় না। মুই বিধবা মানুষ, এমন করিয়া মোক থাকা লাগবে, জীবনে ভাবো নাই। কি করিম, আল্লাহ্ যতদিন হায়াত দিছে, এমন করিয়া জীবন চলি যাইবে।’

ষাটোর্ধ্ব বয়সী বিধবা মল্লিকা খাতুন বলেন, ‘ছয়টা ব্যাটা-বেটিক মানুষ করনো। বিয়াসাদি দিনো। সবায় এ্যলা আলাদা থাকে। মোর স্বামী নাই, তায় মারা গেইছে। মুই এ্যলা (এখন) সবার কাছে অচল মানুষ। ব্যাটা বেটিরা ভাত দিবার চায় না। অসুখ হইলে ওষুধপাতি চিকিৎসা করায় না। কষ্ট করি থাইকপার (থাকতে) না পারি এই বৃদ্ধাশ্রমোত চলি আসি আচু।’

মল্লিকার দীর্ঘদিন ধরে কানের সমস্যা। ঠিক মতো চিকিৎসা করাতে না পারায় এখন কানে কম শুনতে পান তিনি। কয়েকদিন ধরে শরীরটা বেশি ভালো যাচ্ছে না এই বৃদ্ধা মার। তিনি দাবানলকে আরও বলেন, ‘মোর ব্যাটাগুল্যাও ভালো না, বউও না। বউ কয় হামরা নিজে ছইল (সন্তান) নিয়্যা চইলবার পারি না, তোমাক (শাশুড়িকে) কোত থাকি খোওয়ামো। মেয়ে তিনটার অবস্থা ভালো না। সবাই অভাবের মধ্যে আছে। মোর কোনো গতি হয় নাই, এই জন্য আইজ জীবনোত এতো কষ্ট।’

এই বয়স্ক পুণর্বাসন কেন্দ্রে স্বামী সন্তানহারা এক অসহায় বৃদ্ধা রয়েছেন। যার দু’চোখে এখনো পুরোনো দিনের স্মৃতি ভাসে। পরিবার পরিকল্পনায় চাকরির জন্য তিন মাস প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন জমিলা বেগম। কিন্তু চাকরির ট্রেনিং শেষ করেই তাকে বসতে হয় বিয়ের পিড়িতে। তখন উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন। স্বামীর সংসারে গিয়ে উচ্চ শিক্ষার বাসনা থেকে ডিগ্রীর বই কিনে পড়ালেখা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তার আর কলেজে ভর্তি হওয়া হয়নি।

অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে হওয়ায় অকালে সন্তান প্রসব করেন জমিলা বেগম। সেই সন্তান বেশি দিন বাঁচেনি। এরমধ্যে তার শ্বাশুড়ি আর নিজের মায়েরও মৃত্যু হয়। জমিলার সংসারও টিকেনি। স্বামী, সন্তান, সংসার হারিয়ে দুঃখের অতল সাগরে পড়েন তিনি। ৩৯ বছর ধরে তিনি বাবার বাড়িতে ছিলেন। কিন্তু এখন ছোট ভাই আর দুই বোন ছাড়া কেউ নেই তার। সবাই সবার মতো ব্যস্ত থাকায় জমিলার দেখভাল করে না। বাধ্য হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে চলে এসেছেন জমিলা। এখানেই তিন বছর ধরে রয়েছেন তিনি।

জমিলা দাবানলকে বলেন, ‘আগে ভাবতাম ছেলে মেয়ে থাকলে হয়তো এত কষ্ট হত না। বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হত না। কিন্তু এখন তো দেখি ছেলে মেয়ে থেকেও শান্তি নেই। অনেকে এই আশ্রমে আছে, যাদের ছেলেমেয়েরা মা-বাবাকে দেখাশুনা করে না। সেই হিসেবে আমি ভালো আছি। এই বৃদ্ধাশ্রমে ভালো খাচ্ছি, থাকছি, কোন সমস্যা নেই। আগের দিনের কথা মনে পড়লে কান্না আসে, কষ্ট লাগে।’

নূরজাহান, আমেনা, মল্লিকা, জামিলা, রহিমার মতো এরকম অনেকেই আছেন দেবী চৌধুরাণী বয়স্ক পুণর্বাসন কেন্দ্রে। যাদের বেশির ভাগই এখানে এসেছেন ছেলের সংসারে মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে। আবার কেউ কেউ এসেছেন কোনো কুলকিনারা না পেয়ে। কারো কারো পরিবারে অভাব অনটনও রয়েছে। তবে সবার মধ্যেই এক সময় ছিল দু’বেলা মুঠো ভাত, কাপড়, ওষুধ আর সেবা যন্ত না পাওয়ার অভাব। সেই অভাব পূরণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন এই পুণর্বাসন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক রাজেকা রহমান। তাঁদের জন্য প্রতিমাসে গড়ে ব্যয় করছেন ৫০-৭০ হাজার টাকা। রাজেকার বেতনের সাথে স্বামীর ব্যবসার টাকাও যোগান দিতে হয় কখনো। তবে স্থানীয় প্রশাসন ও দানশীল ব্যক্তিদের সহযোগিতা এই পুণর্বাসন কেন্দ্রে পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।

অভাবী, অসহায়-দুস্থ ও স্বামী-সন্তানহারা বৃদ্ধ মা-বাবাদের জন্য ২০১৫ সালে গড়ে তোলা হয় দেবী চৌধুরানী বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রটি। নিজ উদ্যোগে সেবামূলক এই পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন বীমাকর্মী রাজেকা রহমান। বর্তমানে সেখানে ২২ জন অসহায় বৃদ্ধ মা-বাবা রয়েছেন। তাদের থাকা-খাওয়াসহ দেখাশুনা সবই করছেন রাজেকা।

বীমাকর্মী রাজেকা রহমান এক সময় বিভিন্ন শ্রেণী পেশার শত শত মানুষের বাড়ি ঘুরেছেন। সেই সময়ে নিজ চোখে দেখেছেন অভাবে জর্জড়িত পরিবারগুলোতে বয়স্ক মা-বাবাদের দুঃখ-কষ্ট আর বিড়ম্বনা। ছেলের সংসারে বৃদ্ধ শ্বশুড়-শ্বাশুড়ির প্রতি বউয়ের আড়চোখা আচরণ। আবার কোথাও দেখেছেন জমিজমার ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে ছেলে-মেয়েদের কারণেই ঘর ছাড়া অসহায় মা-বাবাদের। অন্যের দুঃখ-কষ্ট দেখে সে নিজে হাঁপিয়ে উঠে। নিজের তেমন সাধ্য না থাকলেও তখনই মনস্থির করেছিল বয়স্কদের পুনর্বাসনে কাজ করবেন তিনি। যেই ভাবনা সেই কাজ। যদিও রাজেকার ভাবনার বাস্তব রূপ পেতে পোড়াতে হয়েছে অনেক কাঠখড়ি।

দাবানলকে রাজেকা বলেন, ‘বৃদ্ধাশ্রমে এসব অসহায় বৃদ্ধ মা-বাবা যতই ভালো থাকুক, কিন্তু তাদের মনে শান্তি নেই। তাদের চোখে মুখে একটা হতাশা কাজ করে। সন্তান থাকার পরও তারা ঘরহীন, আশ্রয়হীন। এমন চিন্তা তাদের তাড়িত করে। আমি সকল সন্তানের প্রতি অনুরোধ করব, মা-বাবাকে কষ্ট দিবেন না। যত কষ্টই হোক মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে জীবনটা উপভোগ করুন। আমি চাই না, কোনো মা-বাবা আমার পুণর্বাসন কেন্দ্রে এসে দীর্ঘদিন ধরে থাকুক। যেই আসুক তারা তাকে সন্তানের কাছে নিরাপদ আশ্রয় পান। আমি সেই উদ্দেশ্য নিয়েই কাজ করছি।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ধরনের আরও সংবাদ
 

দৈনিক দাবানল © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২০

themesba-lates1749691102